শুভময়দা একটা বক্তৃতা শুনতে বলল। অধ্যাপক আব্দুল কাফির। শুনলাম। শুভদা গুরুস্থানীয়, যাই বলে মন দিয়ে শুনি। আব্দুল কাফির নাম আগে শুনেছি, বক্তব্য শুনিনি। এই প্রথম। বেশ লাগল।
বিষয়ঃ ধর্ম কি আমাদের নিজস্ব পছন্দ, নাকি সমাজ ও পরিবার থেকে পাওয়া একটি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পরিচয়?
উনি বললেন, ধর্ম অবশ্যই আমাদের নিজস্ব পছন্দ না, উত্তরাধিকার। একদম সত্যি কথা। ঢের দিন আগে অঞ্জন দত্ত পর্যন্ত বলে গেছেন। এ নিয়ে যে এখনো বক্তৃতা দেওয়া দরকার হচ্ছে, সেটাই বরং ভাবনার। উনি মূল যে প্রশ্নটা করলেন, সেটা তেমন নতুন না, হামেশাই লিবেরাল আলোচনায় শুনতে পাই। যা আমাদের ওপর আরোপিত, প্রায় র্যান্ডম একটা জিনিস, তা আমরা এত প্রবলভাবে বিশ্বাস করি কেন? কেনই বা তার জন্যে অন্যের ওপর আমাদের এত আক্রোশ।
শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল আচ্ছা উলটোটা হওয়া কি কাম্য? ধরুন ধর্ম যদি একটা নিজস্ব পছন্দ হত। ফ্রি উইল বলে আদৌ কিছু হয় কিনা সেসব শক্ত তর্কে যাচ্ছিনা। নেহাত সাধারণ চিন্তায়, যেমন করে সাইন্স, কমার্স, আর্টস নেয় লোকে, তেমন ভাবেই যদি ধর্ম পছন্দ করা যেত। প্রথমে নানান ধর্ম সম্বন্ধে জানতাম, ক্লাস ফাইভ থেকে টেন, তারপর ভেবেচিন্তে মাথা লাগিয়ে কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান কি জরাথ্রুস্টিয়ান হতাম? তাইলে কি বেটার কিছু হত? অধ্যাপক কাফির বক্তব্য শুনে মনে হয়, হয়ত।
ঘোড়ার ডিম।
ধর্ম পছন্দের জিনিস হওয়ায় কেউ যে আটকাচ্ছে তা নয় (মানে RSS কি তালিবান আটকাবে, ওদের না বললেই হল), কিন্তু তাতেও কেউ বদলাচ্ছেনা। অফিসিয়ালি পছন্দ করতে বাধ্য করলেও খুব কম লোকই বদলাত। কারণ জানতে হলে, আমাদের একটু অন্য প্রশ্ন করতে হবে। ধর্ম কি কাজে লাগে?
খুব সোজা কথায় ধর্ম কোন ব্যক্তিগত প্রকল্প নয়, একটা সামস্টিক পরিচয়। দলবাজি। আপনি উত্তরাধিকারে পান বা নিজে বাছেন। ব্যাপারটা দলীয়। স্বভাবতই ধর্মের প্রধান কাজ বিধর্মীকে চিহ্নিত করা, এবং পারলে তাকে ক্যালানো।
আপনি একা বসে ঈশ্বরের ধ্যান করলে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। যেমন আপনি ঘরে বসে মাস্টারবেট করলে কেউ চাপ নেয়না, মন্দির, মসজিদ, গির্জা লাগেনা, তেমনি হত। স্বর্গে যেতেন কি দোজখে, আপনি আর আপনার ঈশ্বর বুঝতেন। আমার বাপের কি?
কিন্তু তাই দিয়ে ধর্ম চলে না। কাউকে ক্যালাতে না পারলে সেই ধর্মের দু-পয়সা দাম নেই।
অধ্যাপক কাফি ব্যাপারটা জানেন, সোজাসুজি বলেন না যদিও, একটু খতিয়ে দেখলেই বুঝবেন। এই ধরুন পরিচয় কথাটাই (বিষয়)। পরিচয় কি কাজে লাগে? অন্যদের জানাতে, নিজের জন্যে না নিশ্চয়ই। অধ্যাপক আর যে দুতিনটে উদাহরণ দিলেন, যেমন, কাকে আমরা ধার্মিক বলি (ধর্ম চিহ্ন যারা উগ্র ভাবে ধারণ করেন) , কোন ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত অধার্মিকরাও ধর্ম পালন করেন (বিয়ে, জন্ম, মৃত্যু), কেমন ভাবে আমাদের ধর্ম পালন স্মৃতি নিয়ন্ত্রিত (তুলসীতলায় সন্ধে দেওয়া), সেগুলোও হরেদরে একই কথা বলে।
ধরুন এই ধার্মিক ব্যাপারটাই, পরিচয় নাহয় অন্যের জন্যেই হল, উগ্র পরিচয়ের কি এমন প্রয়োজন? ধরুন কেউ খুব ধার্মিক, মাথায় টিকা, শিখা, কি দাড়ি, টুপি, খেটো পাজামা, ইত্যাদি। আপনি বুঝলেন যে তিনি ধার্মিক। লাভটা কি? আপনি কি তাকে গুরু মানবেন, তার সাথে ধর্মের আলোচনা করবেন?
আসলে না, আমরা ধার্মিক লোককে মাথায় রাখি, কারণ যখন লড়াইটা হবে, আমরা নিশ্চিত যে এ মালটা আমার দলে। ধার্মিক পরিচয়টা মূলত জার্সি, ভিড়ের মাঝে দলটা চিনতে সুবিধে হয়। নইলে ধরুন ঘর হিন্দু-মুসলিম রায়ট চলছে, আর আপনি শার্ট-প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আমি বুঝব কি করে আপনি কোন দলে লড়বেন। এই anxiety কাটাতেই ধর্মচিহ্ন, আর ধার্মিকদের এত কদর।
প্রশ্ন হল, ধর্ম পরিচয় আমাদের এত পছন্দ কেন? কাদেরই বা তেমন পছন্দ নয়? এটা আমরা অন্য নানান পরিচয়ের সাথে তুলনা করে দেখতে পারি, যেমন জাতি, দেশ, শিক্ষা, লিঙ্গ ইত্যাদি। এই পরিচয়গুলো ক্ষমতার এক একটা অ্যাক্সিস। যে পরিচয় সবথেকে সহজে অর্জন করা যায়, এবং সবথেকে ক্ষমতা দেয়, সেইটা বেস্ট পরিচয়।
স্বভাবতই, ধর্ম খুব কাজের। অর্জন করতে খরচা কম, শিক্ষা/বিত্ত এসবের তুলনায়। আর যদি দলে অনেক হওয়া যায়, আর কম লোকের দলকে পাওয়া যায় যেটা অন্য ধর্মের, তাইলে সবথেকে সুবিধে। ফলে, ধরুন ভারতবর্ষে, দুটোই আছে, অনেক হিন্দু, খানিক কম মুসলিম, পয়সাকড়ি তেমন নেই, ক্ষমতা গণতান্ত্রিক, সুতরাং ধর্মের আতিশয্য, ক্যালানোর অনেক সুযোগ। একই ভাবে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদিতেও। অন্যদিকে ইউরোপে ধর্মের মারপিটটা খানিক তামাদি হয়ে গেছে, কারণ ঔপনিবেশিক পরিচয় আরো সহজে এই সুবিধেগুলো দেয়। ক্রুসেডের তুলনায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেক লাভজনক ব্যবসা। চিহ্নের প্রয়োজন অবশ্য এখানেও, কোলকাতার হাফ-ইংরেজদের জামাকাপড় চাষাভুষোর সাথে যায়না।
আবার হিন্দু ধর্মটা ধরুন, বরাবর আমরা শুনি যে কি আহা হিন্দুদের কি উদারপন্থা। কুরান বা বাইবেলের মত লিটারাল না, ঔপনিষদিক পুরুষোত্তম থেকে কলেরা তাড়ানো সাব-অল্টাঁন সবই চলে। কারণটা বলিনা। সোজা কিন্তু। হিন্দুরা আরেকটা পরিচয় আবিষ্কার করেছে, যেটা ধর্মের চেয়ে বেটার, তা হল জাতি। ফলে হিন্দুবৃত্তে ধর্ম খানিকটা দার্শনিক। কাফের পেটানোর প্রয়োজন কম, চাঁড়াল পেটালেই চলে। এর একটা সাইড এফেক্ট হল যে ধর্মচিহ্নের তুলনায় জাতিচিহ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইদানীং অন্য ধর্ম ঢুকে ব্যাপারটা খানিক ঘেঁটে গেছে, টিকা/টিকি গোছের জাতিচিহ্নগুলো ধর্মচিহ্ন বলে চলছে। উদারতাও কমছে/কমবে, মুসলমানদের ঠ্যাঙ্গাতে চাঁড়ালদেরও যোগ চাই কিনা।
অধ্যাপক কাফি লিবারালদের ধর্মপালনের উদাহরণে স্মৃতির গুরুত্ব সম্বন্ধে বলেছেন, তুলসীতলায় প্রদীপ দেওয়া মার আঁচল ইত্যাদি। জাতি চিহ্নের ক্ষেত্রে কি এরম রোমান্টিক স্মৃতি পাওয়া যায়? আমার নিজের বন্ধুবান্ধবের মধ্যে ধার্মিক প্রায় কেউ নেই, জাতিভেদে বিশ্বাসীও নেই, কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই পইতে পরে, এখনো। পইতের অনুষ্ঠান তো করেই, একশো ভাগ।
পইতে জিনিসটা যে চুলকানির যন্ত্র হিসেবে কি অসাধারণ, তাদের থেকেই শোনা। কেউ যে এখনো সেটা পেটেন্ট করে দেশবিদেশে বেচেনা, এটাই আশ্চর্য।
ভিতর ভিতর কথাটা অন্য, পইতে ক্ষমতার চিহ্ন, নিজের থেকে ছাড়া অপ্রাকৃতিক, অমনটা হয়না।
এইভাবে দেখলে লালনের রেটরিকাল প্রশ্নেরও জবাব পাবেন। বামনির পইতা নেই, কারণ বামনির ক্ষমতা নেই। লিঙ্গ বনাম জাতি, লিঙ্গ জয়ী। ফলে বামনির নিজেকে চেনানোর প্রয়োজন নাই। কোন পরিচয় কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে যদি ফিরে যাই, লিঙ্গ পরিচয় সহজ, অনতিক্রম্য, এবং অসীম ক্ষমতাধারী, ৫০% লোকের ওপর ছড়ি ঘোরানো যায়। ফলে ধর্ম যার যার, নারী নির্যাতন সবার, কোন ব্যত্যয় নেই।
অনেক হল, শেষ করি। শেষের টপিক সর্বধর্ম সমন্বয়, যত মত তত পথ।
এতক্ষণ যদি পড়ে থাকেন, তাইলেই বুঝবেন, এটা ধাস্টামো, হবার নয়। এই কথাটা মূলত হিন্দুরা (কারণ জাতি) আর যারা ধর্ম নিয়ে কেয়ার করেনা, তারাই বলতে পারে। ইসলামি বা কেরেস্তানি গুরুরা খানিক ভেবলে যায় এসব শুনলে।
এই ব্যাপাটা নিয়ে চমৎকার পড়াশুনো করেছে লোকজন। শিম্পাঞ্জিদের দেখে।
শিম্পাঞ্জিদের নিয়ে অনেক সুবিধে। আপনারা জানেন নিশ্চই আমাদের ৯৮.৮% ভাগ DNA শিম্পাঞ্জিদের সাথে কমন অর্থাৎ আমরা ঈশ্বরের বরপুত্র হলে, ওরা কম করে বর-ভাইপো। তাছাড়া ওরা আমাদের মতই হলেও আমরা নয়, আমরা ওদের অনেকদিন আগেই হারিয়ে দিয়েছি কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট নেই। তাই খানিক নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখা যায়।
শিম্পাঞ্জি বিশেষজ্ঞরা দেখেছেন যে ওদের মধ্যে স্বার্থ আর পরার্থপরতা দুইই দেখা যায়। পরার্থপরতা প্রধানত দলের ভেতর কাজ করে, অন্যদিকে স্বার্থপরতা দল নিয়ন্ত্রিত না। আরো মজার ব্যপার হল যে শিম্পাঞ্জিরা দলের সদস্যদের প্রতি বেশি দয়ালু/উপকারী, তারা দলের বাইরের শিম্পাঞ্জিদের প্রতি ততোধিক নির্দয়/হিংস্র। উলটোদিকে যারা অতি স্বার্থপর, তারা বাইরে ভিতরে প্রায় এক। এই অংকটাই একটু টানলে দেখবেন যে ধর্মের ব্যাপারটা বোঝা যাবে। যে যত ধার্মিক, সে তত পরধর্ম বিরোধী, "যত মত” বাদীরা হয় মিথ্যুক নয় হ্যালু।
বাকি রইল মানব ধর্ম, তার জন্য এলিয়েন ইনভেশন লাগবে।
পুনশ্চঃ
১/ লেখাটায় অসম্ভব সরলীকরণ হয়েছে। ধর্মের মত শক্ত বিষয়। আত্মা, অধ্যাত্ম, পরমব্রহ্ম, শঙ্করভাষ্য, শূন্যবাদ, এসব ছেড়ে শিম্পাঞ্জি। জেনেশুনেই। গোষ্ঠী মানুষ সরল প্রাণী, ধর্মের কাজ পেটানো।