Saturday, July 18, 2026

জেনেশুনে তবু ভুলে আছি

অনেকদিন ধরে ভাবছি কিছু নিয়ে কটা খারাপ কথা লিখি, আজ ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখে ভাবনাটা রূপ পেল। আমার আজকের বিষোদ্গারের বিষয় বাঙ্গালির প্রিয় গান, বন্ধুত্ব, নস্টালজিয়া আর আঁতলামোর অ্যান্থেম, “কফিহাউসের সেই আড্ডাটা গানটা শুনলে আমার আগাপাস্তলা জ্বলে যায়। একেবারে শুরুর লাল্লালালা থেকে চিড়বিড়ানি শুরু হয়, - প্যারা শুনে ফেললে দাঁত কিড়মিড় করে, রক্তারক্তি পায়। আপনাদেরও জ্বালাই একটু, খানিক ক্যাথারসিস হবে। 


প্রথমে দুটো ডিসক্লেমার। এক, গানটার গুনগত দিক নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই, সে যোগ্যতাও নেই। এর গীতিকার/সুরকার স্বনামধন্য, গায়ক কিংবদন্তি। গানটার জনপ্রিয়তা অসামান্য, এখনো, প্রায় ৪৫ বছর ধরে। বিবিসির ভোটে সর্বকালের লিস্টে তিন নম্বর নাকি। আমার একটু ব্যক্তিগত পক্ষপাত আছে গীতিকারের প্রতি, তা নিয়ে বলব পরে, বাকি কিছু না। দুই, কফিহাউস জায়গাটা অখাদ্য। বয়েসকালে কোলকাতার যে কটা আইকনিক জায়গায় গেছি, কফিহাউস, অলিপাব, ফ্লুরিস, পিটার ক্যাট, ইত্যাদি, সবকটাই অসম্ভব খারাপ। নেহাত খেপে না উঠলে এগুলোর ত্রিসীমানায় যাওয়া উচিত না। কিন্তু তার সাথে লেখার সম্পর্ক নেই, কফিহাউস দারুণ জায়গা হলেও, গানটা একইরকম খারাপ হত।  


আমার প্রধান রাগ গায়ক চরিত্রটার প্রতি। আমি দেখাতে চাই যে আপাতভাবে লোকটাকে যা মনে হয়, বন্ধুবৎসল, সমব্যাথি, আঁতেল (বা আঁতেলমন্ন), সিম্পল লিভিং হাই থিঙ্কিং বিশ্বাসী, ইত্যাদি, এগুলো একটাও ঠিক নয়। 

লোকটা পরশ্রীকাতর, মিথ্যুক, লোভী, নারীবিদ্বেষী, আর সর্বতভাবে ভণ্ড। এক কথায় খাঁটি বাঙ্গালি ভদ্রলোক। আয়নায় যেমন দেখি।


আমার গৌণ রাগ আপনাদের নিয়ে, যারা গানটা ভালবাসেন। এই যে এদ্দিন ধরে এতজনকে গানটা গাইতে/শুনতে শুনেছি, কারুর কাছে কোনদিন কোন আপত্তি শুনিনি। বলা বাহুল্য, আমার চেনা লোকজন মোটামুটি সেকু, মাকু, লিবারাল (লিবটার্ড), ফেমিনিস্ট  গোছের, ঠিক মমতাশঙ্কর নন। সেই বাজারেও কারুর যে গানটা নিয়ে কোন চাপই হয়না, অবিমিশ্র ভালো লাগে, এটা আমি ধরতেই পারিনা।  


যাক গে আসুন পড়ি গানটা। দুতিন প্যারাতেই লেখা শেষ হয়ে যাবে। তারপর দেওয়ালে মাথা ঠুকতে যাব। 


কফি হাউসের সেই আড্ডাটা … 


নিখিলেশ প্যারিসে, মঈদুল ঢাকাতে,
নেই তারা আজ কোন খবরে,
গ্র্যাণ্ডের গীটারিস্ট গোয়ানিজ ডিসুজা
ঘুমিয়ে আছে যে আজ কবরে


এই অব্দি বলার কিছু নেই, খালি একটু আহা, আশির দশকেরঅমর-আকবর-আন্টনি" ধর্ম সমন্বয়। এখন এরম লিখলে বাড়িতে লেঠেল আসবে। 


কাকে যেন ভালোবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে
পাগলাগারদে আছে রমা রায়,
অমলটা ধুঁকছে দুরন্ত ক্যানসারে
জীবন করে নি তাকে ক্ষমা হায় ।।


এইখানেই দেখুন, কেমন একটা সূক্ষ্ম তফাত। অমলের ক্যান্সারটা জীবনের অক্ষমা, কারুর দোষ নেই। একটু পরেই জানবেন যে সবাই সর্বক্ষণ চারমিনার খেত, তাতে কিছুনা। রমা রায়-এর কেসটা কিন্তু আলাদা। কেউ একটা আঘাত করেছে, তাই রমা পাগলাগারদে, অর্থাৎ আসামি হাজির। আমার মত যারা দোষশাস্ত্রে পণ্ডিত, তাদের এক মুহূর্ত বুঝতে অসুবিধে হয়না যে দোষী কে। অবশ্যই একটি মেয়ে। আপনি বলবেন, আহা রমা রায় কি গে হতে পারেনা, নামটা তো বেশ "লালিমা পাল, পুং" গোছের। উঁহু, তেমন হলে দোষ দেওয়াটা এতো সহজে আসতনা। রমা বেচারাকেও দায় নিতে হত। এখানে তা নয়। রমা বিষমকামী পুরুষ। যারা মেয়েদের ভালবাসে, প্রতিদানে আঘাত পেয়ে পাগলাগারদ যায় (আর ফেরেনা) নেহাত ক্যান্সারটা এখনো প্রমাণ হয়নি, নইলে অমলেরটা অমন অ্যাবস্ট্রাক্ট থাকত না। 


সূক্ষ্ম নিয়ে আর বলতে হবেনা, পরের প্যারাটা স্ট্যান্ড-আউট। 


সুজাতাই আজ শুধু সবচেয়ে সুখে আছে
শুনেছি তো লাখপতি স্বামী তার,
হীরে আর জহরতে আগাগোড়া মোড়া সে
গাড়িবাড়ি সবকিছু দামী তার


আমার ধারনায় এই স্তবকটা বাংলা গানে অনন্য। চারলাইনের মধ্যে এমন কান ধাঁধানো অসভ্যতা, ভাবা যায়না। এক এক করে বলি। 


প্রথমত, সহজ কথা। বন্ধু যদি সুখী হয়, তাতে যদি আপনার ভালো না লাগে, শুধু হিংসে হয়, তাইলে সে বন্ধুত্বের যোগ্য আপনি নন। প্যারাটা আরেকবার পড়ুন, সুজাতার সুখে কি গায়ক খুশি? না। এই লাইন কটার ভাব থেকেই লোকটার মনের পরিচয় স্পষ্ট। এর গলায় বন্ধুত্বের জয়গান মানায়?  


দ্বিতীয়ত দেখুন কেমন মিথ্যাবাদী, সুজাতা সুখী বললেই হত, তা না, আলাদা করে জানিয়েছে শুধু সুজাতা- সুখী। কেন রে বাঁদর, এই যে নিখিলেশ, মইদুল, দিব্বি করে খাচ্ছে, প্যারিসে কি ঢাকাতে, এই যে তুই প্যানপ্যান করে গান ধরেছিস, এদের দুঃখের কারণটা কি? ওই - টা পরিষ্কার মিথ্যে। কারণ? নইলে আলাদা করবেন কি করে, দোষটা কার হবে। 


তিন- দেখুন হারামিপনার চরম, সুজাতা- একমাত্র সুখী, কিন্তু সেকি নিজের ধকে? মোটেও না। একখানা  সরেস বর বাগিয়েছে, তার পয়সায় ফুটানি, গাড়ি বাড়ি হিরে জহরত। আমাদের গায়ক বাবুর মনটা নেহাত বড়, তাই আমাদের সে কথা পরিষ্কার করে জানিয়ে দিলেন, পাছে আমরা ভাবি যে সুজাতা নিজের জোরে কিছু করে ফেলেছে। নিখিলেশ বাপ/শ্বশুরের পয়সায় প্যারিস গেল কিনা, মইদুলের মেসোর কাগজের ব্যবসা কিনা, রমার চাকরির তদবির কে করল, গায়কটা নেপো-কিড কিনা, নিয়ে কারুর কোন মাথাব্যাথা নেই, খালি সুজাতার অন্যায়টা জানলেই যথেষ্ট।  


শেষে দেখুন ভণ্ডামিটা, সুজাতা কেন সুখী, কারণ তার (আসলে বরের) অঢেল পয়সা, আর কিচ্ছু জানার প্রয়োজন হয়নি। তা বাপু, তাতেই যদি তোর এতো হিংসে তবে কফিহাউসে বসে আঁতলামো না কপচে, পয়সাকড়ির উপায় করলে হতনা? আঁতেল না হতিস, বড়লোক হবার একটা আশা ছিল, না হলেও খানিক সৎ হতিস। যামিনী রায় কি বিষ্ণু দে চটকালে যে তাতে কোন লাভ হবেনা এটা নেহাত পাগলেও জানে। 


উলটোটাও ভাবুন, সুজাতার টাকাকড়ি আছে বলে সে সুখী, তার আর কোন উচ্চাশা থাকতে নেই। অমলের মত কবিতা ছাপা কি গ্র্যান্ডে গিটার বাজান কি মেয়েদের সাজে? তারা বড়লোকের বউ হলেই জীবন সফল, কি অপূর্ব দর্শন আমাদের বিষ্ণু দে পড়া আঁতেলের। 


এখন প্রশ্ন হল, এইরকম একটা খারাপ স্তবক রাখার কারণ কি, গীতিকার কি শিল্পীরা কি ভাবেননি একেবারে? নাকি এটা হিট করারই একটা কৌশল? যেমন ভাবে, বন্ধুত্ব, কফিহাউস, চারমিনার, আঁতলামোর মিশেল দিয়ে মন টানা, তেমনি এক ছটাক স্বাদু নারীবিদ্বেষ। পুরুষ মনে সুড়সুড়ির আনন্দ, মেয়েদেরও খুশি। দ্যাখ সুজাতাটা কিরম স্বার্থপর, বরের পয়সায় বড়লোকি, এদিকে ভালো ভালো ছেলেগুলোর কি কষ্ট কি কষ্ট


বাকি গানটা আমার শোনা হয়না। তবু আর দুএকটা লাইনের কথা বলি। রাগের জন্যে না। গীতিকার (গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার) কেমন সূক্ষ্ম মুনশিয়ানা দেখান, তার উদাহরণ হিসেবে। 


আর্ট কলেজের ছেলে নিখিলেশ সান্যাল
বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকতো,
আর চোখ ভরা কথা নিয়ে
নির্বাক শ্রোতা হয়ে
ডিসুজাটা বসে শুধু থাকতো ।। 


নিখিলেশ বড় ঘরের ছেলে, বামুন। এমনি এমনি প্যারিস যায়নি। ডিসুজার বর্ণনাটা অসাধারণ, বাঙ্গালি আড্ডায় অন্যভাষিদের যে কি দশা হয়, ভুক্তভোগী ছাড়া জানা অসম্ভব, সেটা এমন রোমান্টিক ভাবে বলেছেন


একটা টেবিলে সেই তিন চার ঘন্টা
চারমিনারটা ঠোঁটে জ্বলতো, …
 

চারটেতে শুরু করে জমিয়ে আড্ডা মেরে
সাড়ে সাতটায় ঠিক উঠতাম ।।


বাকিদের কথা জানিনা, তবে এই আড্ডার শিডুলে রমা রায়-এর অফিসের কাজ কেমন চলত, তা বলাবাহুল্য। কি যেন কথাটা ছিল, কর্ম-সংস্কৃতি। 


 কবি কবি চেহারা কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ
মুছে যাবে অমলের নামটা,
একটা কবিতা তার হোল না কোথাও ছাপা
পেলনা সে প্রতিভার দামটা


অমলদের ভারি দুঃখ, ডাকঘরের, রোদ্দুর (রায়?) হতে চাওয়া অমলের, তারপর এই দেবশিশুটির। আমার এক মেশোমশাই ছিলেন অমল, অমলদের মধ্যে বোধহয় তিনিই সবচেয়ে তৃপ্ত। তবে এটা আশ্চর্য যে কবিমন্ন্য বেচারা জানেনা যে কেউ কারুর কবিতা ছাপেনা, তার জন্যে নিজেকেই পত্রিকা ছাপাতে হয়, লিটিল ম্যাগাজিন।  


আমার খারাপ কথা শেষ। 


আপনাদের কেউ কেউ বলবেন, আহা আশির দশকের গান, তখন আমরা আরেকটু বেশি নারীবিদ্বেষী ছিলাম, আর কদিন আগে সতীদাহ হত, আর এমন কি। তাইলে একটা নতুন বই-এর কথা বলি, ২০০৭- সালের লেখা, গওহর জানকে নিয়ে। লেখক একাধারে ঐতিহাসিক, সঙ্গীতজ্ঞ, এবং সমাজতাত্ত্বিক, আর অবশ্যই আধুনিক ভদ্রলোক (ইনি বাঙ্গালি নন) ভূমিকাতেই চমক, লেখক খানিক কৌতুক করে বলছেন যে এই গানবাজনার লাইনে কাজ করার শুরুতেই ওঁর মা সাবধান করেছিলেন, "বাছা, কদাচ বাইজি-টাইজিদের ছায়া মাড়িওনা, নষ্ট মেয়েদের পাল্লায় পড়না" অথচ ভাগ্যের কি ফের, গওহর জানের বই লিখতে গিয়ে সেই বাইজি ঘাঁটতেই হল। যাই হোক, মাতৃ-আজ্ঞা পালনে এই বিচ্যুতিতে উনি সমৃদ্ধই হয়েছেন, মাও তেমন মাইন্ড করেননি, ইত্যাদি। 


ভাবুন ব্যাপারটা! গওহর জান, যিনি কিনা ভারতবর্ষের প্রথম রেকর্ডিং স্টার, অদ্বিতীয়া শিল্পী, আরো অন্তত ৫০ জন এইরম বাইজির গান ইউটিউবে আমি-আপনিও শুনতে পারি, যাদের গান ছেড়ে দিন, পাদের তুলনীয় শব্দ করার ক্ষমতা ভূভারতে আর কারুর নেই,  তাঁদের সকলের প্রথম এবং প্রধান পরিচয় নষ্টত্ব। আধুনিক ঐতিহাসিক/গবেষকও এর বাইরে ভাবতে পারেন না, শেখেননি। 


ঝাঁট কি সাধে জ্বলে। 


--- 

এটা কিন্তু নস্টালজিয়ার কথা না, সত্যি কথা। ধরুন কদিন আগে ওয়েস্ট-ইন্ডিজের সেরা ব্যাট ছিলেন ভিভ রিচার্ডস, এখন রস্টন চেস। দিনেশ দাশ-এর ভাষায়, " যুগের চাঁদ হল কাস্তে"