Sunday, September 19, 2021

য পশ্যতি ১

বাচ্চাবেলায় একটা শ্লোক পড়েছিলাম যার শেষটা ছিল পশ্যতি পন্ডিতঃ অর্থাত যে দেখে সেই পন্ডিত। খুব মনে ধরেছিল। সেই থেকে আমি মোটামুটি দেখার ধান্দায়। ফলে পন্ডিতিও অনেক জমেছে। ভাবছি বিতরন করি। আপনাদের একটু ফান্ডা দি। কদ্দিনই বা আছি। 


প্রথম গল্পটা বলিভিয়ার, ২০১৮ সাল।


কিসের একটা দিন তিনেক ছুটিতে বলিভিয়া গেছি। প্রথম লা পাজ। লা পাজ সম্বন্ধে নানান সাইট থেকে পড়ে জানলাম, যে লা পাজ খুব উঁচুতে। ওখানে গেলে মাথায় অক্সিজেন কম যায়, আর তাতে যা যা হয়, মাথা ধরা থেকে হ্যালুসিনেশন। ফলে সাবধান। আর এত সবাই জানে যে লা পাজে পেলে বলিভিয়া যে কোন টিম কে বলে বলে হারায় (ফুটবলে) আর কেউ শ্বাসই নিতে পারেনা, খেলবে কিএইসব ভাবতে ভাবতে নামলাম। এরপরে বাসে চড়ে সিটি সেন্টার যাব। 


নেমে থেকেই একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। এয়ারপোর্টে, বাসেও। বেশ কিছু লোক, মাথায় একটা পট্টির মত জিনিস পরেছে। এই ইহুদিরা যেমনটা পরে, মাথার সেই জায়গায়। কিন্তু দেখতে অন্যরকম। অনেকটা মাম্পস হলে গালে যেমন পরে, সাদা ফুটোফুটো, ওইরম। বেশিরভাগ মাঝবয়েসি, কয়েকটা ছেলে-ছোকরা। 


সেন্ট্রোতে নেমে প্রথম চমক এক যাদুকর। আলাদীনমার্কা সাজ পরে ক্রিস্টাল বলের খেলা দেখাচ্ছেন। সাথে বুমবক্সে বাজছেজয় জগদীশ হরে অনুরাধা পড়য়াল, টী সিরিজ, গুলশন কুমার। ভাবুন। দেখতে দাঁড়ালাম। মন বসলনা। এদিকওদিক সেই পট্টিমাথা লোক অনেক। 


কি ব্যাপার? সেই হিচহাইকার্স গাইড টু গ্যালাক্সির শুরুতে ছিলনা? একটা অন্ধ, দুটো অন্ধ। সাত নম্বর অন্ধ দেখে লেখক সবে বাস্তবকে সন্দেহ করতে শুরু করেছেন, দেখলেন সামনে কোথায় অন্ধদের কনভেনশন। এখানে কি পট্টির কনফারেন্স নাকি, ইয়ার্কি হচ্ছে। এদিকে মাথায় অক্সিজেন যাচ্ছে কি যাচ্ছে না। খুব ঘেঁটে গেলাম। 


আমার পট্টির সমস্যার অত সহজ উত্তর হলনা। এদিকে স্প্যানিশ বলা লোকেদের এইসব প্রশ্ন করার কোন উপায় নেই। কারণ আপনি যতইনো হাব্লা এস্প্যানিওলবলুন (অর্থাত কিনা আমি স্প্যানিশ বলতে পারিনা), তারা এস্প্যানিওলই বলবেন, প্রচন্ড তাড়াতাড়ি বলবেন। আর আপনি যে একটুও বুঝতে পারছেননা তার তোয়াক্কা না করে যতটা বলতে ইচ্ছে ততটাই বলবেন। এই দুহপ্তা আগে মেক্সিকো থেকে ফিরছি। ইমিগ্রেশন অফিসার। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই হুড়মুড়িয়ে কিসব বলে চল্লেন। আমি বার দুএক  “নো হাব্লা এস্প্যানিওলবলে কোন লাভ হলনা দেখে যা যা লাগে আর কি, পাসপোর্ট, ভিসা, কোভিড টেস্ট রিপোর্ট সব এগিয়ে দিলাম। মহিলা বললেন, “বোলেতো আমি আবারনো হাব্লা এস্প্যানিওল কোন বিকার নেই।বোলেতো?” এরম খানিক্ষন চলার পরে আমি গুগল ট্রানস্লেট খুলে দেখলাম, “বোলেতোটিকিট। যেহেতু মোবাইলে, তাই দেওয়া হয়নি। এই পুরো সময় মহিলা একটু ভুরু কুঁচকোন ছাড়া আর কিচ্ছু হেল্প করেননি, শুধু বোলেতো। 


ইমিগ্রেশন অফিসার এরম হলে, বাকিরা ভাবুন। ফলে জিজ্ঞেস করার উপায় নেই। একটু বাদেই খেতে যাবার কথা, তাই তখন ওই রইল। রাতে অনেক ভেবেও বিশেষ কিনারা করতে পারলামনা। সবথেকে প্রোবাব্ল মনে হল কোন ধর্মীয় কিছু হবে। খেরেস্তান কাল্ট কোন। কিন্তু ওরম আধুনিক পট্টি? খুঁত থেকেই গেল। 


উত্তরটা পেলাম দিন দুই বাদে। একটা গ্রুপের সাথে ঘুরতে গেছি এল অল্টো বলে একটা শহর। জীপ খানিক, তারপর রোপওয়ে। সে দলে অনেক ইংরিজিবলা লোকজন। ফেরার পথে তাদের একজনকে জিগালাম, “আচ্ছা, আমি দুদিন ধরে লা পাজ- একগাদা পট্টি মাথা লোক দেখলাম, অথচ এখানে নেই, হ্যালুসিনেশন?” বললেন "না না, তা কেন? তুমি জানোনা?” জানলাম লা পাজ নাকি টাকে চুল ফেরানোর স্বর্গ? কম দামে পুষ্টিকর। সমস্ত দক্ষিন আমেরিকা, এমন কি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা থেকেও অনেকেই আসে। আর সেই চুল গজানোর অপারেশনের পরে কয়েকদিন এই পট্টি পরে থাকতে হয়। আমি তো থ। 


আপনারা জানতেন? তবে


পরেরবার টাকে চুল গজাতে চাইলে, লা পাজ ঘুরে আসুন। একটু সাবধান হবেন, মাথায় অক্সিজেন কম যায় কিনা। বেশ উঁচুতে। 


এইখানে বলে রাখি, এইসব পথে শোনা গল্প উইকিপিডিয়ায় যাচাই করার মত দুর্বুদ্ধি আমার কখনো হয়নি। যেরম মনে আছে বললাম। নেহাত গুল হলে অক্সিজেনের অভাব দায়ি, আমার দোষ নেই। 

Saturday, October 24, 2020

হাথরাসে আর আশপাশে

হাথরাসের ঘটনার প্রতিবাদে কোলকাতায় মিছিল বেড়িয়েছে দেখলাম। খুশীর কথা। কিন্তু আমরা আবার বেশি না ভাবি যে এসব দূরের কথা, আমাদের আশপাশটা ভালোই আছে, তাই ভাবলাম কটা কথা লিখে রাখি।

আমার মামি, বাসে ট্রামে হাতে একটা চুলের কাঁটা রাখতেন। যদি কেউ এখানে সেখানে হাত দেয়, তাইলে তার বিঁচিতে কাঁটা বিঁধিয়ে দেওয়াই ওর পছন্দের ডিফেন্স। বলতেন "চিৎকার করতে পারবেনা, বুঝবে ঠ্যালা।এইসব কথা যখন হচ্ছে, তখন আমি ১৪, মামি মধ্য চল্লিশ। 


আরেক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম ধর্মতলায় এক টেলারের কথা, সালোয়ার কামিজ বানান। এই লোকটা প্রতিবার মাপ নেওয়ার সময় প্রতিবার নিপলের উপরে হাত রেখে বুকের মাপ, আর কোমরের মাপটা একটু নীচ দিয়ে। বন্ধু ১০-১১ থেকে ২৩-২৪ অব্দি এর কাছে গেছে, কোনদিন অন্যথা হয়েনি।


এই বন্ধুর সাথে আরেকবার। বাসে। খুব ভিড়। কন্ডাকটার দেখলাম হাতটা উল্টে আছে, আশীর্বাদ-এর মূদ্রা। কেন? যে কজনের বুকে হাত দেওয়া যায় আর কি। দিনের শেষে গুনে রাখে নিশ্চই।


আরেকজন বন্ধু। এই কদিন আগের কথা। সে, তার দিদি আর মা ভিড় রাস্তায়। একজন যাবার পথে তিনজনেরই গায়ে হাত দিয়ে যায়। বন্ধুর বয়েস তখন ১১, দিদির ১৫, মার ৪০। লোকটার আনন্দ ভাবুন, জেনারেশনাল মলেস্টেশন।


নিজের অভিজ্ঞতা। হরিসভার মেলায় ভাইবোনদের সাথে। সখেরবাজার চন্ডীমেলায় বন্ধুদের সাথে। কেউ হেঁটেকেউ সাইকেলে করে। কেউ বুকে কেউ পাছায়, পারলে পায়ের ফাঁকে। চলছে চলবে।


ছোটবেলা থেকে এতগুলো মেয়েকে চিনি। কাউকে চিনি না, যে যথেষ্ট রকম অ্যাবিউস্ড নয়। একজনও না। বাড়িতে (সব থেকে বেশি), অফিসে, রাস্তায়। এরমধ্যে আমার থেকে ১৫-২০ বছর বড় থেকে ২০-২৫ বছর ছোট অব্দি। বেশিরভাগ কলকাতার বা আশেপাশে। শহর যদি এতই ভাল হত, একটা দুটোকে কি আমরা ছেড়ে দিতাম না? আর এতজনকে আবিউস করতে গেলে কত লোক লাগে ভাবুন। আমি আপনি সবাই। লুকোবার উপায় নেই। পিজিয়ন হোল প্রিন্সিপল।   


অবশ্য মন্দের ভাল, এদের এখনো কেউ কেটে ফেলেনি। তার জন্যে আর কদিন বাকি।


বন্ধু পড়ে বললএস ডি ফোর, এস ডি এইট, এস থার্টিওয়ান, সেজো কাকা, দিদির শশুর, অনেক আরো।

যত দোষ

 এই যে এস এস আর সুইসাইড করেছে আর তাই নিয়ে রিয়া চক্রবর্তী কে সবাই মিলে যাতা হেনস্থা করছে, কেউ কেউ তাতে অবাক। আমি তাদের দেখে অবাক। তাদের জন্যেই দোষের সহজ পাঠ। 

দোষ কীসে হয়? কীসে- সাথে দোষের কোন সম্পর্ক নেই। এই ধরুন এস এস আর মরে গেছে, আর রিয়া চক আর গাঁজা খায়। এর মধ্যে ফালতু লজিক খুঁজলে দোষের মাধূর্যটাই মিস করবেন।


দোষের প্রথম কথা বিদিশার বাবা শিখিয়েছিলেন। কাকু বলতেনদোষ ফেলে রাখতে নেই, দিয়ে দিতে হয়।অর্থাৎ, দোষ নিয়ে কথা বলে লাভ নেই, যদি দোষী না পান। ভাগ্যের দোষ ইত্যাদি বলে ফিলসফাইজ করতে পারেন, কিন্তু দিয়ে সমাজ বা টি আর পি কোনটাই চলেনা। আসল কথা হলদোষ কার?” এইটা জানতে পারলেই বাকি জলবৎ। ইন ফ্যাক্ট দোষ কীসেটা, দোষ কার -এর সাবক্লজ মাত্র।


তাইলে দোষ কার? খুব সহজ, “দোষ আমাদের না।”  আমাদের ছেলেরা রেপ করে না। আমাদের মেয়েরা গাঁজা খায় না। আমাদের পাড়ায় এইসব অসভ্যতা হয় না। আমাদের যা যা হয়, ঘর বাড়ি বংশ পাড়া দল শহর রাজ্য দেশ ভাষা ধর্ম জাত, সব নির্দোষ। তাইলে কার দোষ? ওদের, অফকোর্স। ওরা যারা আমরা নই, যারা আমরা হতে চাইনা, তাদের দোষ। একটাই রুল। ওই যে বলছিলাম দোষ কীসেটা আনিম্পর্ট্যান্ট, কারটাই আসল, এটাও এই নিয়মেই পড়ে। আপনি যদি আমাদের ছেলে হন, তাইলে আপনি খুন করলেও জাস্টিফাইড। আর যদি ফালতু বিধবা টাইপ হন (সংসারে যাদের স্থান বোঝাতে লীলা মজুমদার অমোঘ, "হাফ ঝি হাফ পাপোশ"), তাইলে আপনার একাদশীতে ভাত খাওয়াও দোষের। 


আমরা জিনিসটা আবার বেটার দ্যান ইকুয়াল টু। অর্থাৎ আমার দোষ হয়না ইম্প্লাইজ আমার বাবার দোষ হয়না, গুরুর দোষ হয়না, ব্রিটিশদের দোষ হয়না, এটসেট্রা। 


কটা গল্প বলি। 


প্রথমটা ১৯৮৪ সালের, আমি অনেক পরে শুনেছি যদিও। আমরা তখন সানি প্রিপেরাটরি (পেঁপের তরকারি) স্কুলে নার্সারিতে। একদিন কি কারণে খানিক দোষ পড়েছিল, নেবার লোক নেই। এক বন্ধুকে কেউ একটা জিজ্ঞেস করেছে কার দোষ? উত্তর সন্দীপ আইন। বুঝুন ঠেলা, শুধু যে দোষ আমার নয় তা না, সে তখন আমায় চেনেওনা। অনেকদিন পরে কেন ভাবতে গিয়ে ওর মনে হয়েছিল (গল্পটা ওরই বলা) নামটা ইন্টারেস্টিং বলে। আসলে তা না। নামটা আলাদা। মুখার্জি, ব্যানার্জি, বোস, সেনদের মাঝে আইন। ওই সাড়ে তিনেও আমরা জানি যে দোষ আমাদের না, ওদের। 


পরেরটা অনেকদিন বাদের। এটাও শোনা। তদ্দিনে বড় হয়ে গেছি। মদ, গাঁজা খেতে শিখেছি। তেমনি একটা ঠেকে একটা নতুন ছেলে জুটেছে। আকাট ভালো ছেলে। তার গাঁজা খেয়ে একদম হয়ে গেছে। কোনক্রমে বাড়ি গেছে। সেখানে প্যানিক অ্যাটাক। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে সে বুঝেইছে কিছু নেশা। কিন্তু তারপরেই চাপ, সে ডাক্তারকে যতই বলে যে কি খেয়েছে কোথায় খেয়েছে। ডাক্তার বলে, “না, ওই বাড়ির ছেলেরা তো এসব করবেনা, তুমি মিথ্যে বলছ চাপটা ভাবুন, একে মালটার প্যানিক অ্যাটাক, তারপরে অবিশ্বাস। ছেলেটিও কিন্তু খুবি ভদ্রসভ্য বাড়ির, এখন যে কিছু খেয়েছে, তা নিঃসন্দেহ, কিন্তু তাই বলে দোষ তো আর চারটে ভালো ছেলের হয়না। একটা বস্তিবাড়ির নাম বললেই সমস্যা মিটে যেত। দোষ ঠিক জায়গায় পড়ত। 


আরো? এইটা কদিন আগের। কলকাতায় করোনা কিরম বাড়ছে আলোচনায়, “আর বোলনা। একে তো এত ঝামেলা, তারমধ্যে এই করোনা। মুসলমানদের মধ্যেই বেশি গো, খুব নোংরা তো ওরা


আরো? ইন্ডিয়া এগেন্স্ট কোরাপশন। একটা মুভমেন্ট যার একটাই দাবি, আমরা ছাড়া সবাই চোর।


এবার একটা অ্যাপ্লিকেশন। ধরুন গতবছরআর আমি ডিভোর্স করেছি। ডিভোর্স যে খারাপ তাতো জানেন। দোষটা কার? ভাবতে হচ্ছে? আমি কি আপনাদের ছেলে নই? কিন্তুকে পাচ্ছেন কোথায় যে দোষ দেবেন। সে গুড়ে গ্রিনকার্ড। তাইলে? একটু ছড়িয়ে দিন। আজকালকার মেয়েরা।


রিয়া চকেরটাও। আমাদের ছেলে তো আর সুইসাইড করেনা। তাদের এমনি জীবন তুলসিপাতা। কোথাও একটা মেয়ের দোষ। তারপর সে মেয়ে যদি গাঁজা খায়। ছি ছি।